Friday, November 10

শৈলকুপায় রাজনীতিকদের লোভের বলি সংখ্যালঘুরা

শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে প্রয়াত সত্যেন্দ্রনাথ সাহা পরিবারের বাড়ি দখল করে আধুনিক ডিজাইনে নির্মাণ করা হয়েছে চারতলা ‘মোল্লা টাওয়ার’। নিচতলায় সামনের অংশে মার্কেট, পেছনে আবাসিক ফ্ল্যাট। ওপরের তিনতলা আবাসিক ফ্ল্যাট। শৈলকুপা উপজেলা যুবলীগের সভাপতি শামীম হোসেন মোল্লা ও তার বাবা উমেদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা সাবদার হোসেন মোল্লার বিরুদ্ধে দখলের অভিযোগ ওই সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের।

শুধু সত্যেন্দ্রনাথ সাহার পরিবারই নয়, শৈলকুপায় এমন শত শত সংখ্যালঘু পরিবার ঘরছাড়া হয়েছে। বেদখল হয়েছে সম্পত্তি। সব হারিয়ে অনেকে থাকছেন ভাড়া বাসায়। দখলে যুক্ত প্রভাবশালীদের হুমকি-ধমকির কারণে অনেকে নিজ ভূমির মায়া ত্যাগ করে স্থায়ী আবাস গেড়েছেন ঢাকায়। ভুলেও এলাকামুখো হন না। দেড় দশক ধরে এমন অরাজকতা চললেও মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ প্রভাবশালী রাজনীাতিকরা। কারণ, এই দখলে জড়িত প্রায় সবাই রাজনৈতিক কর্মী। আর তাদের পেছনে আশীর্বাদের হাত রয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্যের। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বলছেন, আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে ফের তাদের ঘরছাড়া হওয়ার আতঙ্ক ঘিরে ধরেছে। প্রায় প্রতিদিনই সম্পত্তি দখলের অভিপ্রায়ে চলছে মহড়া। হুমকি-ধমকি মারধর। মন্দিরে হামলা, সম্পত্তি দখল, প্রতিমা ভাঙচুরের মতো ঘটনাও ঘটছে অহরহ।

সর্বশেষ গত সোমবার রাতে উপজেলার বিজুলিয়া গ্রামের কুঠিবাড়ি কালীমন্দিরের শিবমূর্তি ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। এর আগে গত বছরের অক্টোবরে ডাউটিয়া গ্রামে শতবর্ষী কালীমন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। আর এ ঘটনায় নেতৃত্ব দেন উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি দিনার বিশ্বাস। তার বাবা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিয়ার রহমান।


সরেজমিন ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে দখল করে ভবনটি নির্মাণ করা হয় প্রয়াত সত্যেন্দ্রনাথ সাহা পরিবারের ২৪ শতক জমি দখল করে। মূল্যবান এ জমি দখল করতে শামীম ও সাবদার সত্যেন্দ্রনাথের চাচাতো ভাই প্রশান্ত কুমার সাহাকে আয়ত্তে নেয়। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া বায়নাপত্রের মাধ্যমে প্রশান্তকে পুরো জমির মালিক বানিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ২০১৩ সালে প্রশান্তর কাছ থেকে এ জমি কিনে নেন বাবা-ছেলে। অতি গোপনে করা দলিলও করে ফেলা হয়। এরপর যখন দলবলসহ শামীম মোল্লা বাড়িটি দখল করতে যান, তখনই তা সত্যেন্দ্রনাথের পরিবারের দৃষ্টিতে আসে। এরপর তারা আদালতের আশ্রয় নেন। কিন্তু আদালতের নিষেধ উপেক্ষা করেই স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় সেখানে নির্মাণ করা হয় মোল্লা ভবন।

সত্যেন্দ্রনাথ সাহার ছেলে জ্যোতি প্রশাদ সাহার স্ত্রী মল্লিকা সাহা বলেন, আমাদের বাড়ি ও কালীমন্দির জোর করে শামীম মোল্লা দখল করে নেয়। আমি তখন সবার কাছে যাই, কিন্তু ন্যায়বিচার পাইনি। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাচ্ছি আমরা যেন সুষ্ঠু বিচার পাই। তিনি বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য আবদুল হাইয়ের কাছেও গিয়েছিলাম। কিন্তু এমপি আমাদের বললেন, ‘কাগজপাতি আছে তা আমি কী করব। কাগজপাতি ধুয়ে পানি খা গিয়ে। এরপর থেকে আর কারও কাছে যাই না। রেকর্ড তো আমাদের নামে আছে। জমি যাবে কোন জায়গায়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমরা খুব অসহায়। কোথাও বিচার পাইনি। আমাদের সম্পত্তি ফেরত চাই। আমরা সুস্থ জীবনযাপন করতে চাই।’

শৈলকুপায় কালীমন্দিরে শিবমূর্তি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে গত সপ্তাহে। স্থানীয়রা বলছেন, কে বা কারা রাতের অন্ধকারে শিবমূর্তিটি ভেঙে রেখে পালিয়ে যায়। বিজুলিয়া কুঠিবাড়ি কালীমন্দিরের সাধারণ সম্পাদক দীলিপ কুমার বলেন, ‘১০০ বছর ধরে আমাদের পূর্বপুরুষরা এখানে পূজা অর্চনা করে আসছেন। গতকালও দেখেছি মন্দিরের অভ্যন্তরে অবস্থিত মূর্তিগুলো ভালো ছিল। সকালে দেখছি মূর্তি ভাঙা। কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ ঘটনা ঘটাতে পারে। এর সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে ন্যায় বিচার আশা করছি।’

শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মেহেদী ইসলাম বলেন, ‘ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মন্দির পরিদর্শন করেছি। অতিসত্বর আমরা মন্দিরের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

গত বছরের ৬ অক্টোবর রাতে শৈলকুপার ডাউটিয়া গ্রামের কালীমন্দিরের দরজার তালা ভেঙে প্রতিমা ভাঙচুর করে একদল লোক। প্রতিমার মাথা ২০০ গজ দূরে মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদকের বাড়ির পাশে ফেলে রাখে তারা। এ ঘটনায় স্থানীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরদিন মন্দির কমিটির সভাপতি সুকুমার মণ্ডল বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন পুলিশ সুপার আশিকুর রহমান জানিয়েছিলেন, দিনার বিশ্বাস নামে এক যুবকের পরিকল্পনা ও প্ররোচনায় গভীর রাতে মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়। দিনার বিশ্বাস শৈলকুপা উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। তার বাবা মতিয়ার রহমান শৈলকুপা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ধলধরাচন্দ্র ইউনিয়নের চেয়ারম্যান।

উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি দিনার হোসেন ঘটনার দিন রাতে পাঞ্জাব আলী খানের ছেলে ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তুষার খান, আমজাদ হোসেনের ছেলে ও ধলহরাচন্দ্র ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি সাজ্জাদ হোসেনসহ তাকে বাড়িতে ডেকে আনে। পুলিশকে শায়েস্তা করতে হবে বলে পরিকল্পনা নেওয়া হয়। দিনারের নির্দেশে তিনিসহ সাজ্জাদ ও তুষার ডাউটিয়া কালীমন্দিরে ঢুকে কালিমূর্তির মাথা ভেঙে রাস্তায় ফেলে রাখে। এ ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখা, এবং ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করায় জেলার পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধেও বিষাদাগার করে ওই প্রভাবশালীরা। এর কিছুদিন পরই বদলি হন ওই পুলিশ সুপার।

গত বছরের ১ আগস্ট শৈলকুপা উপজেলার কামারিয়া গ্রামে আট হিন্দু বাড়িতে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ওই হামলার ঘটনায় অন্তত ১৫ জন আহত হন। ঘটনার এক দিন পর দায়ের করা মামলায় ৩২ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত পরিচয় আরও ২৫ থেকে ৩০ জনকে আসামি করা হয়। ১০ নম্বর বগুড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম শিমুলের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ মেম্বার, ইউনিয়ন যুবলীগের সহসভাপতি ফরিদ মুন্সী মেম্বরের নেতৃত্বে জুয়েল, ইফতি, বোরহান, হামজা, কামাল, আদরসহ ৪০ থেকে ৫০ জন ওই হামলায় অংশ নেয়।

মামলায় অভিযোগে বলা হয়, হামলাকারীরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গ্রামে ঢুকে প্রথমে চায়ের দোকানদার দেব কুমারের কাছে ৩ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে এবং মারধর শুরু করে। সার ব্যবসায়ী বিকাশ মণ্ডল লাঙ্গলবাঁধ বাজার থেকে ফিরছিলেন। তার কাছ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় হামলাকারীরা। তাকেও মারধর করে। এরপর হামলাকারীরা বিভিন্ন বাড়িতে ঢুকে গালাগাল করে ত্রাস সৃষ্টি করে। বিভিন্ন ঘরে ঢুকে টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করে। মামলার বাদী রতন চন্দ্র কুণ্ডু বলেন, মাঝে মাঝে সন্ত্রাসীরা এ গ্রামে এসে চাঁদা দাবি করে। না পেয়ে বকাবকি করে। চাঁদাবাজির কারণে এ হামলা হয়েছে।

স্থানীয় সংখ্যালঘু নেতাদের অভিযোগ, প্রায় প্রতিনিয়তই শৈলকুপায় বসবাসরত হিন্দু ধর্মালম্বীদের বাড়িতে হুমকি-ধমকি চলে। দেশ ছাড়া করে জমি দখল করে নেবে—এমন হুমকি দেয় প্রভাবশালীরা। তারা বলছেন, এরই মধ্যে অনেকেই এলাকা ছাড়া হয়েছেন। অনেকে ভয়ে জমিজমা স্বল্পদামে বিক্রি করে দিয়েছেন। অনেকে আবার স্থায়ীভাবে শৈলকুপা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। তারা বলছেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে এসব বিষয় নিয়ে অভিযোগ জানালেও তিনি আমলে নেন না। উল্টো নানাভাবে কটূক্তি করেন।

চলতি বছরের ১ এপ্রিল ঝিনাইদহ জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে ঝিনাইদহ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই এমপিকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না দেওয়ার দাবি জানান বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতারা। সম্মেলনে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কনক কান্তি দাস সভাপতিত্ব করেন।

সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ‘গত অক্টোবরে শৈলকূপা উপজেলার ডাউটিয়া গ্রামে শতবর্ষী কালীমন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুর করা হয় উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও ধলহরাচন্দ্র ইউপি চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান বিশ্বাসের ছেলে দিনার বিশ্বাসের নেতৃত্বে। এ ঘটনায় হামলাকারীদের বাঁচাতে মরিয়া হয়ে পড়েছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুল হাই। তিনি একাধিকবার ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে যারা এমন ঘটনা ঘটিয়েছে, তারা কখনোই আওয়ামী লীগের মঙ্গল চান না।’

তারা বলেন, ‘এ সব নেতারা তাদের ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল করার জন্য সবসময় ব্যস্ত থাকেন। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা দাবি জানাচ্ছি, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা এমপি আব্দুল হাইয়ের মতো সংখ্যালঘুদের জমি দখল, বাড়িঘর ভাঙচুর, মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুর ও নির্যাতনকারীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন, তাদের আর যেন মনোনয়ন না দেওয়া হয়।

সব ধরনের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক চন্দ্রনাথ পোদ্দার কালবেলাকে বলেন, সামনে নির্বাচন। এ সময়ে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রুখতে না পারলে সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা বাধাপ্রাপ্ত হবে। সেইসঙ্গে এই অপকর্মে যুক্ত সবাইকে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে না।

তিনি বলেন, আমরা সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতার নেপথ্যে থেকেও কেউ যদি ইন্ধন জোগায়, আমাদের দাবি থাকবে রাজনৈতিক দলগুলো সেইসব জনপ্রতিনিধিদের কোনো অবস্থাতেই যেন মনোনয়ন না দেয়।

https://www.kalbela.com/ajkerpatrika/lastpage/37663

No comments:

Post a Comment